আলু চাষ পদ্ধতি

কৃষি শিক্ষা

আলু বাংলাদেশের প্রধান সবজি। মোট উৎপাদনের দিক থেকে ধান ও গমের পরই এর স্থান। আলু একটি শরকরা সমৃদ্ধ সবজি। আলুতে ভিটামিন সি, লৌহ ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। আলু দিয়ে রকমারি প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রস্তুত করা যায়। এটি ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। নিম্নে আলুর চাষ পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।

image

আপনারা যারা আলুর চাষ করে লাভবান হতে চান তাদের স্বাগতম জানাই। কারণ এখানে আলু চাষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।

সূচিপত্র: আলু চাষ পদ্ধতি - Potato Cultivation Method

আলু চাষ পদ্ধতি - Potato Cultivation Method

দোআশ ও বেলে-দোআশ মাটি আলু চাষের জন্য উত্তম। এঁটেল মাটিতে আলু ভালো হয় না। গভীর ও হালকা বুন্টের মাটিতে আলুর ফলন ভালো হয়। উৎপাদন ও মৌসুম: বর্ষার পর বৃষ্টিপাত কমে গেলেই আলু লাগানো যায়। মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ পর্যন্ত আলু লাগানোর উপযুক্ত সময়।

আরো পড়ুন: মাটি কাকে বলে কৃষি শিক্ষা

জমি তৈরি: হালকা নরম ও ঝুরঝুরে মাটি আলু বৃদ্ধির জন্য বেশ উপযোগী। বেশ কয়েকটি দর্শন করে মাটিকে গভীরভাবে চাষ ও আগাছামুক্ত করে জমিকে সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে।

আলুর জাতের নাম - Name of potato variety

দেশি জাত : লাল পাকড়ি, চল্লিশা, পাকড়ি ললিতা, দোহাজারী, শিল বিলাতী, বগুড়াই ও আসামী। এসব যাদের আলুর আকার ছোট এবং ফলন কম হলেও এদের স্বাদ এবং দেশীয় পদ্ধতিতে সহজেই গৃহস্থের ঘরে সংরক্ষণ করা যায় বলে এসব জাত এখনও জনপ্রিয়।

উচ্চফলনশীল জাত: মুলটা প্যাট্রোনিস, ডায়ামান্ট, কার্ডিনাল, কুফরী সিন্দুরী ও হীরা।

আলুর বীজ উৎপাদন পদ্ধতি

বীজ হিসেবে আস্ত টিউবার ব্যবহার করা ভালো। তবে প্রয়োজন মত সঠিক সাইজ-এর বীজ আলু পাওয়া না গেলে কেটে টুকরা করে লাগাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রতি টুকরায় কমপক্ষে দুটি চোখ থাকে। বীজ আলুর ওজন ২০-৪০ গ্রাম হলে ভালো হয়।

আরো পড়ুন: কৃষি শিক্ষা - ইসলামের দৃষ্টিতে কৃষি নিঃসন্দেহে একটি উত্তম কাজ

বীজ আলু ৫০-৭০ সেমি. দূরে সারি করে সারিতে ২০-২৫ সেমি. দূরে দূরে লাগাতে হবে। তবে দেশী জাতের বেলায় আরো ঘন করে লাগাতে হবে।

আলু রোপণ পদ্ধতি - Method of planting potatoes

এদেশে প্রধানত দু'ভাবে আলু লাগানো হয়। যথা: সমতল পদ্ধতি ও ভ্যালি পদ্ধতি।

সমতল পদ্ধতি: জমি চাষ দিয়ে সমান করে নিয়ে হাত লাঙ্গল। দিয়ে টেনে অগভীর নালা তৈরি করে নালায় নির্দিষ্ট দূরত্বে বীজ বপন করে মাটি দিয়ে ঢেকে সমান করে দিতে হয়।

ভ্যালি পদ্ধতিত: সমতল জমিতে আলু লাগিয়ে দু'পাশের মাটির টেনে  বীজ ঢেকে দিতে হয় এবং চারা গজাবার পর মাটি আরও উঁচু করে ভ্যালি তৈরি করতে হয়। সেচের সুবিধা না থাকলে সমতল পদ্ধতিতেই আলু রোপন করা উচিত।

আলুতে সার প্রয়োগ

আলু চাষে সারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। শতক প্রতি সারের গড় পরিমান নিম্নে দেওয়া হল:

গোব্রর ১৬ কেজি
ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম
টিএসপি ৬৫০ গ্রাম
এমপি ১০০০ গ্রাম

জিপসাম সার ইউরিয়ার অর্ধেক ও অন্যান্য সব সার ৩২৫ গ্রাম জমি তৈরির সময় সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া চারা গজাবার ২৫-৩০ দিন পর সারা বরাবর ক্যালিতে মাটি তোলার আগে উপরে প্রয়োগ করতে হবে। 

আলু পরিচর্যা - Potato care

আগাছা দমন, মাটি তোলা এবং প্রয়োজনমতো সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। সেজের সময় পানির তোড়ে আলু মাটি থেকে বেরিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। উন্মুক্ত আলু সবুজ রং ধারণ করলে তা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এবং সেদিকে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

আরো পড়ুন: সার কি - মাটি পরীক্ষা করার নিয়ম ইত্যাদ

আলু সংগ্রহ ও ফলন

আলু সংগ্রহের উপযুক্ত হলে পাতা ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে গাছ শুকিয়ে আসে। অধিকাংশ গাছের এ অবস্থা হলে আলু তুলতে হবে। জাতভেদে এ অবস্থায় আসতে বীজ লাগানোর পর থেকে ৯০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। হেক্টর প্রতিফলন ২৩-৩০ টন। তবে দেশী আলুর বেলায় ফলন প্রায় অর্ধেক।

আলু সংরক্ষণ - Preservation of potatoes

আলু সংরক্ষণের পূর্বে কিউরিং করার প্রয়োজন হয়। ১৮-২১ সে. তাপমাত্রাই এবং ৮৫% আপেক্ষিপ আর্দ্রতায় ৬-৭ দিন রাখার পর একে সংরক্ষণ করা হয়। একে কিউরিং বলে। আলু সাধারণত দু'পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়।

  • ১. দেশি পদ্ধতি
  • ২. হিমায়িত পদ্ধতি।

এছাড়া বর্তমানে সৌরশক্তির সাহায্যেও আলুকে সংরক্ষণ করা যায়।

দেশি পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ: দেশি পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণের জন্য গৃহের শীতলতম স্থান যেখানে সরাসরি সূর্যকিরণ পরেনা অথচ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত বাশের বা কাঠের মাচা তৈরি করে তার উপর আলু রাখতে হবে।

আরো পড়ুন: গম চাষ পদ্ধতি - গমের বৈজ্ঞানিক নাম কি?

মাচাসমূহ উপর্যপরি ১ ফুট আলুর অন্তর অন্তর স্থাপন করা সুবিধা জনক। এক্ষেত্রে ৩৭ কেজি শুকনো ও আবর্জনা মুক্ত বালির সাথে ১ পাউন্ড সেভিন বা গ্যামাক্রিন পাউডার মিশ্রিত করতে হবে। প্রত্যেক মাচার উপর চারাই বিছিয়ে তার উপর পাতলা এক স্তর ওষুধ মিশ্রিত বালু স্থাপন করে আলুর স্তর ১০-১৫ সে মি. বা ৪-৬ পুরো করে সাজাতে হবে। পর পর আরো বালু দিয়ে আলুর স্তরকে এমনভাবে ঢেকে দিতে হবে যাতে ১.২৫ সে.মি. বা ১/২ গভীর বালুর স্তরের নিচে আলু ঢাকা থাকে।

সর্বোচ্চ মাচা ঘরের ছাদ হতে যেন ৫-৬ ফুট নিচে থাকে। অন্যথা ছাদ হতে বিকিরিত রশ্মি আলুর ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিছুদিন পরপর গুদাম পরীক্ষা করে পচনশীল আলু দেখলে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে ফেলতে হবে। বীজ হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করলে গুদাম যাত করার পূর্বে টিউবারকে ফরমালডিহাইড দারা শোধন করে নিলে পচনের হাত থেকে অনেকটা রেহাই পাওয়া যায়।

গোল আলুর রোগবালাই সমূহ

গোল আলুর রোগবালাই সমূহ বিলম্বধ্বস (মোড়ক), গোল আলুর আগাম ধ্বংস, নেতিয়ে পড়া, ব্ল্যাক লেগ ও পাতা মোড়ানো রোগ ও ভাইরাস উল্লেখ্যযোগ্য। ভাইরাস রোগের কোন প্রতিকার নেই। আক্রান্ত গাছ ক্ষেত থেকে উপড়ে ফেলে দিতে হবে।

আক্রান্ত ফসল থেকে বীজ আলু (টিউবার) সংগ্রহ করা যাবে না। আলুর মড়কই হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক-রোগ। অধিকাংশ জাতেই এ রোগ দেখা যায়। আকাশ মেঘলা থাকলে এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে মড়কের আক্রমণ বেশি হয়।

আরো পড়ুন: জমির খাজনা কত টাকা শতক

তাই এ সময় প্রয়োজনে ১০-১৫ দিন পর পর ডাইথেনএম-৪৫ ওষুধ শতক প্রতি ১০ গ্রাম হিসেবে  প্রয়োগ করতে হবে। অথবা রিডোমিল এম ,জেড,-৭২২ কেজি/১০০০ লিটার পানি/হেক্টর স্প্রে করতে হবে। উল্লেখ্য, টিউবার লাগানোর একমাস পর মড়ক দেখা দিলে ১০০% ফসল নষ্ট করতে পারে।

গোল আলুর পোকামাকড়

গোল আলুর প্রধান অনিষ্ঠকারি পোকা সূতলী পোকা ও কাটুই পোকা। কাটুই পোকা চারাগাছের গোড়া কেটে দেয়। চারাগাছের গোড়া খুড়ে কীড়াগুলো মারতে হবে। সেচ প্রধান করেও কাটুই পোকা দমন করা যায়। আলু কাটার সময় সূতলী পোকার শুক্রকীট আলু বা টিউবারে গর্ত করে ভিতরে ঢুকে পড়ে ও সুরঙ্গ করে ভেতরের অংশ খেতে থাকে।

পোকা খাওয়া আলু কাটলে তার মধ্যে কীড়ায় খাওয়া সুড়ঙ্গ চোখে পড়ে। এজন্য আলু ক্ষেত সবসময় আবর্জনা ও আগাছামুক্ত রাখতে হবে। তোলা আলু ক্ষেতে বেশিক্ষণ না রেখে অবিলম্বে ক্ষেত থেকে সরাতে হবে। রাতের বেলায় আলুর উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বীজ আলু রোপনের পূর্বে জমিতে বসুডিন ১০ জি প্রয়োগ করতে হবে।

ধন্যবাদ-Thanks

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আর আইটি ফার্মের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url