আখ চাষের সময়কাল

কৃষি শিক্ষা

আখ চাষের সময়কাল আমরা অনেকেই জানি আবার অনেকে জানি না। আমরা যদি আখ চাষের সময় কাল জানি তাহলে সঠিকভাবে বীজ বপন সহ সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে পারব।

image

আখ আমরা কম বেশি সবাই পছন্দ করে থাকি, আখের গুড় দিয়ে আমরা নিত্য প্রয়োজনীয় পছন্দের খাদ্য তৈরি করে থাকি যেমনঃ ভাপা পিঠা সহ নানা ধরনের খাদ্য, তো আসুন আমরা আখ চাষের সময়কাল সহ বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

সূচিপত্র: আখ চাষের সময়কাল

আখ চাষের সময়কাল

বাংলাদেশে আগাম আখ রোপনের সময় হল আশ্বিন-কার্তিক মাস। তবে নামলা আখের চাষ চৈত্র মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে। আখের আগাম চাষ করলে ফলন বেশি হয় এবং এর সাথে মিশ্রভাবে অন্যান্য ফসলের চাষ করা যায়। আখ রোপনের সারি থেকে সারির দূরত্ব ৭৫-১০০ সেমি. হতে পারে। আখ রোপনের জন্য ১৭-২০ সেমি. গভীর নালা করা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন: মরিচ চাষের পদ্ধতি

নালাই বীজখণ্ড টানা এক সারি আঁকা-বাঁকা সারিতে বীজ পুতে দেওয়া যায়।নালায় বীজ রোপণের আগে নালার গর্তে পরিমিত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। নালায় বীজখণ্ড রোপণের সময় বীজের চোখ গুলো উপরে নিচে না রেখে দুই পাশে রাখতে হবে।

বীজ রোপনের পর তা ৫-১০ সেমি. পরিমাণ ঝুরঝুরে মাটি দ্বারা ঢেকে দিতে হবে এবং পায়ে হালকাভাবে চেপে দিতে হবে। 

চারা উৎপাদন

শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে দৈর্ঘ্য ১২০ সেমি. চওড়া ১৫ সেমি. বীজতলায় দুই চোখ বিশিষ্ট বীজখণ্ড লাগিয়ে ভালোভাবে চারা উৎপাদন করা যায়। বীজতলার মাটি বীজ তলার মাটি উত্তমরূপে চাষ করে ১.২ মি * ৭.৫মি. বীজ তলায় নিম্নরূপ সার দিতে হবেঃ

গোবর/কম্পোস্ট/প্রেসমান্ড
৮০কেজি
ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম
টিএসপি ৩০০গ্রাম
এমপি ২০০গ্রাম

এবং তরঙ্গ ইউপ্রোকা ও মাজরা পোকা দমনের জন্যঃ

হেপটাক্লোর
৬০ গ্রাম বা দুই আউন্স
ফুরাডান ৫ জি৫০০ গ্রাম

১.২মি.*৭.৫ মি. মাপের ৪টি বীজ তলার চারা দ্বারা এক একর জমি লাগানো যায় (মোট ১২,০০০টি চারা)।

আরো পড়ুন: আলু চাষ পদ্ধতি

গাছের ০.৬৬ উপর  অংশের ৮-৯ মাস বয়সের আখ গাছের দুই চোখ বিশিষ্ট বীজখণ্ড ২০লিটার পানিতে ২০গ্রাম ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে শোধন করতে হবে। একটি আখগাছ থেকে ৮-৯ টি বীজ হয়।বীজখণ্ড গুলোকে চোখ পাশে রেখে বীজতলার মাটির সমান্তরাল পাশাপাশি স্থাপন করে হালকা স্তরে মাটি দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দিতে হবে, যেন বীজখণ্ড গুলো সামান্য দেখা যায়।

 তারপর বীজতলাটি খড় বা আখের পাতা দিয়ে ঢেকে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। বীজতলার রোগ-পোকা আক্রান্ত চারা দেখা দিলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। বীজতলায় চারা দুর্বল হলে ১০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে।

চারা রোপন

বেডের চারা ৪ পাতাবিশিষ্ট হলেই জমিতে রোপন উপযোগী হবে। সাধারণত ৪-৮ সপ্তাহ বয়সের চারা রোপন করা উচিত। যারা উঠানোর সময় যেটুকু মাটি শিকড়ের সঙ্গে উঠে আসে, তা চারা রোপন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারলে যারা দ্রুত লেগে যায় এবং নতুন শিকড়  তাড়াতাড়ি গজায়। চারা শুকিয়ে যাওয়া রোধ করার জন্য রোপনের পূর্বে সমস্ত চারার পাতার তিনভাগের দুই ভাগ অবশ্যই কেটে নিতে হবে।

আরো পড়ুন: গম চাষ পদ্ধতি (নিঃসন্দেহে কৃষি একটি উত্তম কাজ)

সাধারণত ১৫-২৩ সেমি. গভীর নালায় চারা রোপণ ২-৪ সেমি. মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। জমিতে রস কম থাকলে চারা রোপণের সাথে সাথে সেট দিতে হবে। কার্তিক মাস চারা রোপণের উত্তম সময়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা প্লাবিত ভূমিতে ভাদ্র-আশ্বিন মাসেও চারা লাগানো যায়। বীজতলার যারা ১০% পলিব্যাগে তুলে রেখে দিলে তা পরবর্তীতে মৃত চারার শূন্যস্থান পূরণে ব্যবহার করা যায়।

গ্যাপ বা শুন্যস্থান পূরণ

 আখের বীজ বা চারা রোপনের পর মারা গেলে বা অন্যান্য কারণে গ্যাপ সৃষ্টি হলে পুনরায় বীজ বা চারা রোপণ করতে হয়। আখের সারিতে ৬০ সেমির বেশি ফাঁকা থাকা ঠিক নয়। নামলা চাষের বেলায় জমির শূন্যস্থান পূরণের প্রয়োজন হলে আখ থেকে গজিয়ে নেওয়া আখ বীজ দিয়ে পূরণ করতে হবে।

মাটি আলগাকরণ: ভারী বৃষ্টি বা সেচের কারণে জমির উপরিভাগ শক্ত হয়ে গেলে তা কোদাল দ্বারা আলগা করে দিতে হয়। 

আগাছা দমন: মাটি আলগা করণ ও আগাছা দমন উভয়ই একই সময়ে সমাধান করা যায়। আখের বেশি ফলন পেতে হলে অন্তত কয়েকবার আগাছা দমন করতে হবে।

সার প্রয়োগ

আখ চাষ করে বেশি ফলন পেতে হলে জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। শতক পিছু সারের পরিমাণ নিম্নরূপঃ

ইউরিয়া
১-১.৫ কেজি
টিএসপি ৬০০-৭০০ গ্রাম
এমপি ৭০০-৮০০ গ্রাম
জিপসাম ৪০০-৫০০ গ্রাম

রুপা আখ পদ্ধতিতে ইউরিয়ার পরিমাণ বেশি দিতে হবে। নামলা আখের বেলায় ইউরিয়ার পরিমাণ কম হবে। গঙ্গাপোলি অঞ্চলের জিপসাম প্রয়োগের প্রয়োজন নাই। তবে সেখানে শতক প্রতি ১০০গ্রাম জিংক সালফেট বা দস্তা সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষের বেলায় ইউরিয়া ও মিউরেট অফ পটাসের অর্ধেক এবং টিএসপি সারের সবটুকু পরিমাণ বীজখণ্ড লাগানোর সময় নালায় প্রয়োগ করতে হবে।

আরো পড়ুন: সার কি? মাটি পরীক্ষা করার নিয়ম

রুপা পদ্ধতিতে চাষের বেলায় সমস্ত টিএসপি এবং এক তৃতীয়াংশ এমপি সার চারা রোপনের পূর্বে নালাই মাটিতে দিতে হবে। চারা রোপনের ১৫ দিন পর চারার চারদিকে এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ছড়িয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া ও এমপি সার সমান দুই ভাগে ভাগ করে দুই কিস্তিতে কুশি বের হওয়া কালীন সময়ে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। 

আখ বাঁধা

আখের জমি মৌসুমের শেষ দিকে গাছ বড় হয়ে গেলে গোড়া গোড়া করে বেঁধে দিতে হয়। এতে আখ গাছ পরে না এবং ফলন বেশি হয়। আখের মান উন্নত হয়। ভাদ্র-কার্তিক মাস সময়ে আখ গাছ হেলে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে প্রথমে আখের শুকনো ও অর্ধ শুকনো পাতা দিয়ে প্রতিটি ঝাড় আলাদা আলাদা ভাবে বেঁধে দিতে হবে।

পরবর্তীতে পাশাপাশি দুই সারির ৩-৪ টি ঝাড় একত্রে আড়াআড়ি ভাবে বাঁধতে হবে, বাধার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আখের ডগা গুলো পরস্পরের সাথে জড়িয়ে না যায়। 

আখের রোগ-বালাই ও প্রতিকার

বাংলাদেশে আখের ক্ষেত আক্রমণ করে এমন প্রায় ১৫ টি রোগ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক সনাক্ত করা হয়েছে। এখানে কয়েকটি ক্ষতিকারক রোগের প্রধান লক্ষণ উল্লেখ করা হলো।

১. লাল পচা রোগ: আখের কাণ্ড পচে যায়। আক্রান্ত গাছের তৃতীয় ও চতুর্থ পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে গিয়ে ঝুলতে থাকে। চূড়ান্ত অবস্থায় সমস্ত আক্রান্ত গাছটি শুকিয়ে যায়।

২. উইল্ট বা নুয়ে পড়া: আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো আস্তে আস্তে হলদে হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মরে যায়।

৩. স্মার্ট: এই রোগের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল,পত্রগুচ্ছের মধ্যস্তলে একটি লম্বা শীষের উৎপত্তি হয়।

৪. মোজাইক রোগ: আখের পাতার উপর একাধিক বর্ণের সমাবেশে আখের পাতাটিকে মেঝের মোজাইক কাজের মত মনে হয়।

আরো পড়ুন: কৃষি শিক্ষা - ইসলামের দৃষ্টিতে কৃষি

প্রতিকারঃ (ক) রোগমুক্ত সবল বীজ (সেট) রোপন করতে হবে। (খ) রোগাক্রান্ত জমিতে মুড়ি আখের আবাদ করা যাবে না। (গ) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতের আখের আবাদ করতে হবে। (ঘ) উপযুক্ত শস্য পর্যায়ক্রমে অবলম্বন করতে হবে। (ঙ) আলোর ফাঁদের মাধ্যমে বয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলতে হবে।

(চ) বীজ (সেট) শোধন করতে হবে। আখের বীজ শোধনকারী ওষুধ-এরেটান-৬, এগালস, মেরেসান, বর্দোমিক্সার প্রভৃতি। (ছ) পানি দাঁড়ায় না এমন জমিতে আখ চাষ করতে হবে।কেননা আখ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। (জ) ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।

শেষ কথা/উপসংহার

শুকরিয়া সেই মহান রবের যেই আল্লাহ আমাদের এই কন্টেনটি সম্পন্ন পড়ার তৌফিক দান করেছেন। আশা করি এই কনটেন্টটি সম্পূর্ণ পড়ে আখ চাষের সময়কাল সহ বিস্তারিতভাবে আখ চাষ করা বুঝতে পেরেছেন,যদি আমরা এইসব বিষয়গুলো মেনে চাষাবাদ করি তাহলে উচ্চ ফলন পাওয়া যাবে ইনশাল্লাহ।

ধন্যবাদ-Thanks

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আর আইটি ফার্মের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url