ঈমান কাকে বলে

ইসলামিক

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দিন বা জীবন ব্যবস্থা। মানুষের ইহ লৌকিক এবং পরলৌকিক জীবনের সফলতার সকল বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এটি কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের উপর ভিত্তিশীল। এই কন্টেন্ট এ ঈমান কাকে বলে, বিস্তারিত আলোচনা থাকছে।

image
ঈমান কাকে বলে - iman kake bole

আপনারা পেজ সূচিপত্র পড়লেই ঈমান কাকে বলে বুঝতে পারবেন এবং পুরো কনটেন্টি পড়লে ঈমান কাকে বলে সে সম্পর্কে ক্লিয়ার / স্বচ্ছ একটি ধারণা পাবেন ইনশাআল্লাহ।

পেজ সূচিপত্র: ঈমান কাকে বলে - iman kake bole

ইমান শব্দের অর্থ কি? ঈমান কাকে বলে - iman kake bole

ঈমান আরবি শব্দ, ايمان শব্দটি امين থেকে বর্ণিত। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান বলতে বুঝায়,বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) যা নিয়ে এসেছেন তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করার নাম ঈমান'' (তানজিমুল আশতাত,১খ)। এবং ঈমান হচ্ছে এক জিনিস যা অন্তরের বিশ্বাস মুখে স্বীকৃতি ও তা কাজে বাস্তবায়নের নাম ঈমান।

ঈমান ও আকিদার মধ্যে পার্থক্য

আকিদা শব্দের শাব্দিক অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস আন্তরিক বিশ্বাস। পারিভাষিক অর্থে আকিদা বলা হয় যার বহুবচন عقائد(আকাইদ)।

শরিআতের পরিভাষায়:

ما عقد عليه القلب والضمير من التوحيد الرساله وما جاء بهم نبي صلى الله وهو عليه وسلم من عند الله تعالى

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার উপর মনে প্রাণে বিশ্বাস করার নামই আকিদা" (ইকদউল যিনান: পৃ.৭)।

আরো পড়ুন: মুমিন কাকে বলে?

আকিদা শব্দটি তৃতীয় হিজরির পর আসে যখন কোন সাহাবায়ে কেরামের ছিল না অতএব ঈমান ও আকিদা দুটোই এক জিনিস। এক আল্লাহকে ও তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানার মাঝে যে সকল শান্তি নিহিত, তার দলিল ও প্রমাণের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা, মন-মানসিকতায় স্থান দেয় ঈমান ও আকীদার মূল চেতনা।

আকিদা সহিও না হলে বান্দার কোন আমলে গ্রহণযোগ্য হবে না। এককথায় আমল বিশুদ্ধ হতে হলে এবং আমলের ফলাফল পেতে হলে সহীহ আকিদা অবশ্যই প্রয়োজন কুফর নিফাক ও প্রতারণা মন থেকে মুছে বিশুদ্ধ আকিদা পোষণ করে শরীয়ত ও তরিকতের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা একজন সত্তিকারের মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।

ঈমানের মৌলিক বিষয়াদি

ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত আছে। ঈমানে মুফাসসালে  এই বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে । যেমন :

امنت بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الاخر والقدر والخير وشره من الله تعالى والبعث بعد الموت

আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর, ফেরেশতা গণের উপর, তার কিতাব সমূহের উপর, তার রাসুলগণের উপর, পরকালের উপর, তাকদীরের ভালো-মন্দ আল্লাহপাকের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে (এর উপর), আর মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়ার উপর।"

উল্লেখিত মৌলিক বিষয়গুলোর উপর বিশ্বাস ব্যতীত কখনো ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। নিম্নে বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো - আল্লাহ আমাদের রব, তিনি সকল মাখলুকের সৃষ্টিকর্তা, তিনি এক ও, অদ্বিতীয়। সত্যাগত দিক থেকে তিনি যেমন এক ও অদ্বিতীয়, গুণাবলীর দিক থেকেও তেমনি এক ও অদ্বিতীয়; তার কোন শরীক নেই। আল্লাহপাক কোরআনুল কারীমে বলেন:

والهكم اله واحد لا اله الا هو الرحمن الرحيم

তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি দয়াময়, অতি দয়ালু" (সূরা বাকারা আয়াত নং ১৬৩)।

আরো পড়ুন: সূরা ফাতিহা শানে নুযুল - সূরা ফাতিহার ফজিলত ও আমল

আল্লাহর প্রতি ঈমান-এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন, তার মর্যাদা ও সম্মানসহ সকল গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস রাখা। এক কথায় বিশ্বাস রাখা যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনি। এসব কথাই মনকে এমন ভাবে স্থির রাখা যার প্রভাব ব্যক্তির কাজকর্মে প্রকাশ পায়।

তদুপরি আল্লাহর আদেশকে দৃঢ়ভাবে পালন করা ও তার নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিপূর্ণভাবে বর্জন করা-এটাই হচ্ছে ঈমানের ভিত্তি ও প্রাণ। এটা হচ্ছে ঈমানের মূখ্য বিষয় আর অন্যান্য স্তম্ভগুলো হচ্ছে এর শাখা। ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি যেমন.কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব যাকাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

بانيال اسلام على خمس شهادتي ان لا اله الا الله وان محمدا عبده ورسول واقام الصلاه وايتاء الزكاه والحج الصومي الرمضان

ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর,

  1. এ স্বাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল,
  2.  নামাজ কায়েম করা,
  3. যাকাত আদায় করা, 
  4. হজ করা, 
  5. রমজান মাসের রোজা রাখা" (বুখারী ও মুসলিম)।

হাদিসে জিব্রাইলের মাধ্যমে আরেকটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, এহসান তথা তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা ইসলামের অংশ।

আরো পড়ুন: বারাকাহ অর্থ কি?

সমস্ত নবী-রাসুল তাওহীদে উলূহিয়্যাতের দাওয়াতই দিয়েছিলেন আর এটা অস্বীকার করার কারণে অতীতের উম্মতগুলো ধ্বংস হয়েছে। নবী-রাসূলগণের দাওয়াতেই এটাই ছিল মুখ্য বিষয়। এই উদ্দেশ্যেই তাদেরকে পাঠানো হয়েছে, কিতাব নাযিল করা হয়েছে, এর দাওয়াতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মমিন ও কাফির, জান্নাতি ও জাহান্নামের মধ্যে পার্থক্যের এটাই মাপকাঠি আর এটাই হচ্ছে 'লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর মর্ম । আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وما ارسلنا من قبلك من رسل الا نوحي اليه انه لا اله الا انا فاعبدون

আমি রসুলদের নিকট একই বাণী পাঠিয়েছি আর তা হচ্ছে আমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই কাজেই একমাত্র আমারই এবাদত কর"(সূরা আম্বিয়া আয়াত নং ২৫)।

আল্লাহ তাআলা রবূবিয়্যাতে বিশ্বাস রাখা যে অবশ্যক এ সম্পর্কে শরীয়তের বহু দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:

الحمد لله رب العالمين

সকল প্রশংসার মালিক আল্লাহ, যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক।"

মালাইকা তথা ফিরিশতাগনের প্রতি ঈমান

"ফিরিশতা' শব্দটির ফার্সি। আরবিতে ফিরিশতা একবচনে 'মালাক' ও বহুবচনে 'মালাইকা' বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ বার্তাবাহক। ইসলামী পরিভাষায় ফিরিশতার  পরিচিতি হল:

الملائكه جسم نورني متشكل باشكل مختلفه لا يذكر ولا يؤنث ولا ياكل ولا يشرب لا يعصون الله ما امرهم ويفعلون ما يؤمرون

ফিরিশতা' এমন নূরানী মাখলূক- যারা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন, তারা পুরুষ ও নন, তারা নারী ও নন। তারা খানও না, পানও করেন না তারা কখনো আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেন না; বরং সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে রত থাকেন" (কাওয়াইদুল ফিকহ)

বস্তুত: ফিরিশতা নুর বা জ্যোতি থেকে সৃষ্ট। তারা সাধারণত অদৃশ্য, তাদের কোন আকার নেই। তবে তারা বিভিন্ন আকার ধারণ করতে পারেন। তারা আমাদের মতো সৃষ্টি নন। তাদের কামনা- বাসনা , ক্ষুধা-কৃষ্ণা, নিদ্রা কিছুই নেই। তারা সব সময় আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকেন। আল্লাহ যখন যা হুকুম করেন, তারা তাই পালন করেন।

আরো পড়ুন: ইব্রাহিম (আঃ) এর বিবাহ।

এ পৃথিবীতে আল্লাহর তরফ থেকে রহমত অথবা শাস্তি যা কিছু নাযিল হয়, তা এ ফিরিশতাগণের মাধ্যমে নাযিল করা হয়। আল্লাহ তাআলা নবী রাসূলগণের প্রতি যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, তাও তাদের মাধ্যমেই করেছেন। তারা বান্দার আমল লিপিবদ্ধ করেন এবং জান কবয করেন। বিচার দিনে তারা বান্দার ভালো-মন্দ আমলের সাক্ষ্য দিবেন। ফিরিশতাগনের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন:

 وما يعلم جنود ربك الا هو

"আপনার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন", (সূরা মুদ্দাসির আয়াত নং ৩১)

মূল চারজন ফিরিশগণের নাম এবং তাদের কাজ - ফেরেশতাদের নামের তালিকা

চারজন বড় বড়  ফিরিশতাসহ কতিপয় ফিরিশতার নাম আমরা জানি। যেমন :

  • ১. জিবরাঈল (আ), তিনি নবী-রাসূলগণের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। তাকে রূহ বা রুহুল আমিনও বলা হয় ;
  • ২. মীকাঈল (আ) তিনি সকল জীবের জীবিকা বন্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত;
  • ৩. আযরাঈল (আ) তিনি সকল জীবের জীবন বা রূহ কবজ করার দায়িত্বে নিয়োজিত;
  • ৪. ইসরাফিল (আ) যিনি শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার হুকুমের সাথে সাথেই শিঙ্গায় ফুঁক দিবেন এবং তৎক্ষণাৎ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এরপর কেয়ামত কায়েম হবে।

আরো পড়ুন: খালিদ বিন ওয়ালিদ কে ছিলেন

উপরে বর্ণিত চারজন ফিরিশতা ছাড়াও আরো কতিপয় ফিরিশতার উল্লেখ্য রয়েছে। যেমন : কিরামান কাতিবীন, যারা মানুষের ভালো-মন্দ আমল লিপিবদ্ধ করেন; মুনকার ও নাকীর, তারা মৃত্যুর পর কবরে প্রশ্ন করেন। জাহান্নামের রক্ষক ফিরিশতার নাম মালিক এবং জান্নাতের জিম্মাদার ফেরেশতার নাম রিদওয়ান। এমনিভাবে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার অগনিত ফিরিশতা রয়েছেন।

ফিরিশতাগনের প্রতি ঈমান এর অর্থ হচ্ছে : প্রতিটি মুসলিম সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি হচ্ছেন ফিরিশতাগন।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:

 كل كلامن بالله وملائكته وكتبه ورسله

"সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তার ফিরিশতাগনের প্রতি, তার গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তার রাসূলগণের প্রতি" (সূরা বাকারা আয়াত নং ২৮৫)

শেষ কথা

যেসব বিষয়ে আমরা জানলাম আমাদেরকে আল্লাহপাক আমাদের মনে এবং নিজের জীবনে সঠিকভাবে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুক আমিন।।

লেখক:

হাফেজ ক্বারী মোঃ তৌফিক আহমেদ

ধন্যবাদ-Thanks

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আর আইটি ফার্মের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url