মাছের খাদ্য তৈরির ফর্মুলা

মৎস্য চাষ - fish

মাছের খাদ্য তৈরির ফর্মুলা জেনে অধিক মুনাফা অর্জন করার লক্ষে সকল মৎস্য চাষিদের জন্য সুখবর, এই কনটেন্টটিতে মাছের খাবার নিয়ে এবং মাছের দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে সেজন্য সম্পন্ন কনটেন্টটি পড়ুন।

image

সূচিপত্র: মাছের খাদ্য তৈরির ফর্মুলা

ভূমিকা

সকল মৎস্য চাষিদের উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা। সেই জন্য মাছের পরিচর্যা এবং খাবার/খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আপনার পুকুরের মাছের খাবার/খাদ্য জন্য, খাদ্য উপাদান সমূহ, খাবার পরীক্ষা, খাদ্য তৈরি ফর্মুলা, সার প্রয়োগ, সম্পূরক খাদ্য তৈরি পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে জানতে পারবেন। এবং আপনার পুকুরের মাছের জন্য সঠিক খাবার সরবরাহ করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

মাছের খাদ্যের প্রকারভেদ

মাছ তার নিয়মিত দৈহিক বৃদ্ধি, ক্ষয় পূরণ, শক্তি উৎপাদন এবং সুস্থ থাকার জন্য যে সকল খাবার গ্রহণ করে তাই মাছের খাদ্য। মাছের খাদ্যকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, ১ প্রাকৃতিক খাদ্য, ২ কৃত্রিম খাদ্য বা সম্পূরক খাদ্য।

প্রাকৃতিক খাদ্য, পুকুরে চুন সার ইত্যাদি প্রয়োগ এবং সূর্যের আলো থেকে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপন্ন হয়। প্রাকৃতিক খাদ্য আবার দুই ভাগে বিভক্ত যেমন

  • ১ নং ফাইটোপ্লাংকটন বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ
  • ২ নং জু প্লাংকটন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী

কৃত্রিম খাদ্য বা সম্পূরক খাদ্য, মানুষ যে সকল খাবার পুকুরে প্রয়োগ করে যেমন

  • চালের গুড়া
  • গমের ভুসি
  • সরিষার খোল
  • ফিশমিল
  • গুড়া
  • ভুট্টা ইত্যাদি

সম্পূরক খাদ্য আবার দুই ভাগে বিভক্ত ১. উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্য ২ . প্রাণী জাতীয় খাদ্য

আরো পড়ুন: গবাদি পশুর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

আমরা যেহেতু মাছের জন্য সম্পূরক খাদ্য তৈরি করতে চলেছি সেহেতু সম্পূর্ণ খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা গুলো জেনে নিন।

  1. অধিক ঘনত্বে পোনা ও বড় মাছ চাষ করা যায়
  2. অল্প সময়ে বড় আকারে সুস্থ-সবল মাছ তৈরি করা যায়
  3. মাছের দ্রুত শারীরিক গঠন বৃদ্ধি করা সম্ভব
  4. উচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়
  5. মাছের বাঁচার হার বাড়ে এবং মৃত্যুর হার কমে
  6. মাছের পুষ্টির অভাবজনিত রোগ বালাই থেকে রক্ষা পায়
  7. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়

মাছের খাদ্য তৈরি ফর্মুলা - খাদ্য উপাদানসমূহ

উচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য মাছের বৃদ্ধির হার নিশ্চিত করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে মাছের খাদ্য তৈরির ফর্মুলা এবং খাদ্য উপাদানগুলো জেনে নিন।

  • সবুজ উদ্ভিদ কণা
  • টাটকা শাক-সবজি
  • নানান রকমের শস্য দানা
  • প্রণিজ প্লাংকটন
  • রেশম পোকার মূখ
  • শুটকি মাছের গুড়া
  • কসাইখানার রক্ত, নাড়ী ভুঁড়ি
  • পোকামাকড়, শামুক ও ঝিনুক

সবুজ উদ্ভিদ কণা, নানা আকৃতির ও নানা প্রজাতির উদ্ভিদ প্লাংকটন পানিতে তৈরি হয় যেগুলো মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এই ধরনের উদ্ভিদ বেশিরভাগ এক কোষীয় হয়ে থাকে এবং আকৃতিতে প্লাংকটন প্রধানত চ্যাপ্টা বা সরু হয়, এদের মধ্যে নাইট্রেট এবং ফসফেট আছে। পানিতে যদি এই ধরনের প্রাণী থাকে তাহলে পানির কালার দেখতে সবুজ লাগে।

টাটকা শাক-সবজি, তৃণভোজি মাছ খাদ্য হিসেবে টাটকা শাকসবজি গ্রহণ করতে সক্ষম। গ্লাস কাপ উদ্ভিদ ভজি মাছ। যে সকল পুকুরে কচুরিপানা, কলমি লতা, কলাপাতা, ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা, ঘাস ইত্যাদি পাওয়া যায় এবং মাঠের পুকুর গুলোতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা, ঘাস সরবরাহ করা সম্ভব হলে অল্প খরচেই গ্লাস কাপ মাছ চাষ করা সম্ভব।

নানান রকমের শস্য দানা, বর্তমান সময়ে দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন রকমের শস্যদানা মাছের খাবার হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক শস্যদানা দীর্ঘদিন হয়ে গেলে মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। যেমন গম, ভুট্টা, চাউল ইত্যাদি এই সকল খাবারগুলো মাছের খাবার হিসেবে সরবরাহ করলে বেশি ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

প্রণিজ প্লাংকটন, পানিতে প্রচুর পরিমাণে প্রণিজ প্লাংকটন বা প্রাণী কণা জন্মায়। এগুলো মাছের প্রিয় খাদ্য পানিতে সার প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে প্রণিজ প্লাংকটন জন্মানো যায়। আপনারা চেষ্টা করবেন মাছের প্রিয় খাদ্য সরবরাহ করার।

আরো পড়ুন: কৃষি শিক্ষা - ইসলামের দৃষ্টিতে কৃষি

রেশম পোকার মূখ, বাংলাদেশের রাজশাহীতে এবং জাপান ও চীনে রেশম পোকার মূখ পাওয়া যায়। এতে শতকরা প্রায় ৭৫ প্রোটিন থাকে। রেশম পোকার মূখ মাঝে একটি উল্লেখযোগ্য খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেখানে রেশম পোকা চাষ করা হয় সেখান থেকে আপনারা অল্প মূল্যে পেয়ে যাবেন।

শুটকি মাছের গুড়া, শুটকি মাছের গুড়া শিং মাছ এবং মাগুর মাছের জন্য ভালো এতে প্রায় ৫৬ ভাগ প্রোটিন থাকে। আপনারা গমের ভুষি বা চালের গুড়া সাথে মিশে খাওয়াতে পারেন এবং সস্তা পাওয়া যায় এমন মাছ, মাছের নাড়ী ভুঁড়ি পাখনা আঁশ রৌদ্রে শুকিয়ে গুড়ো করে মাছের খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করতে পারেন।

কসাইখানার রক্ত, নাড়ী ভুঁড়ি, কসাই খানের রক্ত সরাসরি ব্যবহার না করে নাড়ী ভুঁড়ি সাথে মিশিয়ে পুকুরে ব্যবহার করতে পারেন নাড়ী গুলোকে টুকরো টুকরো করে কেটে দিবেন এতে মাছগুলোর খেতে সুবিধা হবে। এছাড়াও চালের গুড়া বা গমের গুড়ার সাথে মিশিয়ে মাছের খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করতে পারবেন।

পোকামাকড়, শামুক ও ঝিনুক, বেশ কিছু মাছ রয়েছে যে সকল মাছ সরাসরি পোকামাকড়, শামুক ও ঝিনুক খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে সক্ষম যেমন পাংগাস, ব্লাক কাপ, মাগুর, গলদা চিংড়ি মৃগেল। এছাড়াও বিল নদী নালা থেকে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করে মাছের খাবার হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছে।

পুকুরে মাছের প্রকৃতি খাবার পরীক্ষা

পুকুরে মাছের জন্য যথেষ্ট খাবার আছে কি? তা জানা জরুরী সেজন্য কিভাবে পুকুরে মাছের প্রকৃতি খাবার পরীক্ষা করবেন সে সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

iamge

আপনি তিনটি নিয়মে মাছের প্রকৃতি খাবার পরীক্ষা করতে পারবেন

  1. কাছের কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে সূর্যের আলো মাধ্যমে
  2. সাদা কোন কিছু সুতায় বেঁধে পানিতে চুবিয়ে
  3. হাতের কোন পর্যন্ত পানিতে চুবিয়ে

চিত্রটি দেখেই হয়তো আপনারা বুঝে নিয়েছেন। ১ নং কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে সূর্যের আলোতে ধরলেই পানির মধ্যে কিছু ছোট ছোট প্রাণী দেখা যাবে যদি ছোট ছোট প্রাণী দেখতে পান তাহলে পর্যাপ্ত খাবার আছে না দেখতে পেলে পর্যাপ্ত খাবার নেই।

২ নং এবং ৩ নং পানিতে চুবিয়ে যদি হাত অথবা সুতোয় বাধা সাদা জিনিসটি ৮ ইঞ্চি নিচে দেখা যায় তাহলে পর্যাপ্ত খাবার নেই আর যদি দেখা না যায় তাহলে পর্যাপ্ত খাবার আছে। পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে স্যার ব্যবহার করে খাবার ব্যবস্থা করতে হবে না হলে মাছ চাষে ভালো লাভবান হওয়া যাবে না। আশা করি আপনারা চিত্রটি দেখে পুকুরে মাছের প্রকৃতি খাবার পরীক্ষা করতে পারবেন।

পুকুরে খাবার প্রয়োগ

পুকুরের পানি ও মাছের উপর ভিত্তি করে খাবার সরবরাহ করতে হয়। এবং জলাশয়ে কৃত্রিম খাবার কম লাগে। সাধারণত পুকুরে বা দিঘিতে বৈশাখ মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত কৃত্রিম খাবার একটু বেশি সরবরাহ করতে হয়। এই সময় রুই জাতীয় মাছের বৃদ্ধি বেশি এবং সে জন্য এ সময় মাছের খাবারের চাহিদা বেশি। মোট মাছের ওজনের শতকরা ৩-৫ ভাগ কৃত্রিম খাবার প্রতিদিন সরবরাহ করতে হয়।

যদি দেখা যায় আপনি যেই কৃত্রিম খাবার মাছের খাবার হিসেবে সরবরাহ করছেন তার চাহিদা কম মাছ খাচ্ছে তাহলে খাবার চেঞ্জ করতে হবে। এবং মাছের খাবার চাহিদা যদি বেশি দেখেন তাহলে খাবার বৃদ্ধি করতে হবে তবে লক্ষ্য রাখবেন খাবার যেন নষ্ট না হয়।

খাবার ব্যবহার করার নিয়ম

মাছকে খাবার দেওয়ার জন্য লক্ষণীয় কয়েকটি পয়েন্ট মনে রাখবেন এতে খাবার ব্যবহার করার নিয়ম সঠিক হবে। খাবার নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচবেন এবং পানি দূষণ থেকে বাঁচবেন।

  • নির্দিষ্ট স্থানে খাবার দেওয়া
  • নির্দিষ্ট সময় খাবার দেওয়া সকাল ৯-১০ এবং বিকাল ৪-৫ দুইবার
  • আধাঘন্টা পর পরীক্ষা করুন মাছ কি পরিমাণ খাবার খেয়েছে
  • আপনি যেখানে মাছকে খাবার দেন সেখানে মাঝে মাঝে নেমে পরীক্ষা করুন খাবার জমে আছে কি?
  • খাবার জমে থাকলে পচন সৃষ্টি হবে এবং পানি গ্যাস হয়ে যাবে
  • প্রতি বিঘা পুকুরের জন্য ৩-৪ জায়গায় খাবার দেওয়া যেতে পারে

মাছের খাবার দুই ধরনের হয়ে থাকে ভাসমান এবং ডুবন্ত খাবার নির্দিষ্ট স্থানে বাসের খুঁটি দিয়ে জায়গা করুন যেন পুকুরে খাবার ছড়িয়ে না পড়ে। আর নির্দিষ্ট স্থানে খাবার দিলে মাছ অল্প দিনে বুঝতে পারবে কোথায় গেলে খাবার পাওয়া যাবে।

মাছের খাদ্য তৈরি ফর্মুলা - কৃত্রিম বা সম্পূরক খাদ্য তৈরি পদ্ধতি

মাছ বা চিংড়ির খাদ্য প্রস্তুতের পূর্বে যে প্রজাতির মাছ/চিংড়ির জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতে হবে তার সঠিক পুষ্টি চাহিদা জেনে নিতে হবে। একই সাথে মাছের বয়স সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে কেননা পোনা মাছের আমিষের চাহিদার তুলনায় বড় মাছের আমিষের চাহিদা কম। একই সাথে খাদ্য তৈরির জন্য এমন সব খাদ্য উপাদান বাছাই করতে হবে যেগুলোর গুণগত মান ভালো সহজে পাওয়া যায় এবং দামও কম। আবার নির্বাচিত খাদ্য উপাদানের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান আছে কিনা তা বিবেচনায় আনতে হবে।

আরো পড়ুন: গম চাষ পদ্ধতি

সুষম খাদ্য তৈরির জন্য খাদ্যের সাথে সাধারণত ০.৫ - ২.০% ভিটামিন ও খনিজ লবণ দিতে হয়। তৈরিকৃত খাদ্য পানিতে বেশিক্ষণ স্থিতিশীল রাখার জন্য বাউন্ডারি হিসেবে চিটাগুড়, আটা, ময়দা ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য অধিক উৎপাদন করার পর খাদ্য মজুদ ও প্রয়োগ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উপযুক্ত পরিমাণে এবং মানসম্মত খাবার প্রয়োজন মাছের অধিক উৎপাদন পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগে পানির গুণগত মান নষ্ট হয় ও মাছ রোগ বালাই দেখা দেয়।

খাদ্য প্রস্তুতির উদ্দেশ্য

মাছের পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত খাদ্য তৈরি করা। দেশজ খাদ্য উপাদান সহযোগে পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাদ্য প্রস্তুত করা। খাদ্য উপাদানের গুণগত মান বজায় রাখা। মাছের খাদ্য চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট পরিমাণে খাদ্য প্রয়োগ করা।

সূত্র মোতাবেক পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি করা হলে ১-৫ কেজি নাসারী খাবার প্রয়োগে এক কেজি পোনা মাছ এবং মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে ২ কেজি খাবার প্রয়োগ করে এক কেজি বিক্রয় যোগ্য মাছ পাওয়া যায়।

উপসংহার - শেষ কথা

যে সকল মানুষ মৎস্য চাষ করতে চায় কিংবা মৎস্য চাষ করছে তাদের জন্য মাছের খাদ্য তৈরির ফর্মুলা এবং সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পয়েন্ট উপস্থাপন করা হয়েছে আশা করছি আপনারা এই তথ্য জেনে উপকৃত হবেন এবং মৎস্য চাষ করে সর্বোচ্চ ফলন পাবেন।

ধন্যবাদ-Thanks

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আর আইটি ফার্মের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url